gallery4
07

May14

সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিবাদী হলে নারী সব বাধা অতিক্রম করতে পারবে

শাহীন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অগ্রগতিতে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা রাখছেন। বিশেষত নারী অধিকার রক্ষায় তার অবদান বিরাট। এদেশে নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিতকরণে, নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এখনও নিরন্তর কাজ করছেন তিনি। সম্প্রতি ‘সাপ্তাহিক’ সফল এই নারীর মুখোমুখি হয়েছে নারী বিষয়ক নানা প্রশ্ন নিয়ে। দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে তার ব্যক্তিগত জীবনের নানা সংগ্রাম, নারী অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও নারীর গৃহশ্রমের মূল্যায়নসহ সমসাময়িক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নারী সংশ্লিষ্ট আরও অনেক ইস্যু! সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আনিস রায়হান

সাপ্তাহিক :
এই সাক্ষাৎকারে আমরা আপনার সঙ্গে আজ কথা বলব বাংলাদেশের নারী সমাজের অগ্রসরতার ক্ষেত্রে করণীয় প্রসঙ্গে। প্রথমে আপনার ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করতে চাই। কী ধরনের পরিবেশে আপনি বেড়ে উঠেছেন? পরিবারে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আপনাকে কী ধরনের প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে?

শাহীন আনাম :
আমাদের পরিবারে ছিলাম আমি, আমার তিন ভাই ও মা। বাবা মারা গিয়েছিলেন আগেই। আমার মা অল্প বয়সে বিধবা হয়ে আমাদের মানুষ করার জন্য একাই সংগ্রাম করেছেন। আমাদের পরিবারে কোনো বৈষম্য ছিল না। ভাইরা বেশি সুযোগ সুবিধা পাবে, আর মেয়ে হিসেবে আমি কম পাব, এরকম কোনো বিষয় ছিল না। মা সব সময় আমাকে উৎসাহ দিতেন। তিনি বলতেন তোমার ভাইয়েরা যা পারে, তুমিও তা পারবে। তাই বলতে পারি, পরিবারে বা শিক্ষার ক্ষেত্রে আমি কোনো বৈষম্যের মধ্যে পড়িনি।
কিন্তু সামাজিক কিছু প্রতিবন্ধকতা তো ছিলই। যখন-তখন বাইরে যাওয়া, যে কারও সঙ্গে মেলামেশা করা, এরকম কিছু বিষয়ে মেয়েদের ক্ষেত্রে সাধারণত নানা ধরনের সামাজিক নিষেধাজ্ঞা থাকে। আমাদের বাড়িও তা থেকে মুক্ত ছিল না। তবে আমাদের বাড়ির পরিবেশটা বেশ খোলামেলা ছিল। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে আমার বন্ধুবান্ধব অনেকেই বাসায় আসত। আমি ওরকম কোনো বিধিনিষেধের মুখে পড়িনি।

সাপ্তাহিক :
কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলুন…

শাহীন আনাম :
আমি বেশ ভালো ছাত্রী ছিলাম। লেখাপড়ায়ও আমার উৎসাহ ছিল ব্যাপক। এখানে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেছি। অনার্স পড়ার সময়ই ১৯৭৩ সালে মাহফুজ আনামের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে যায়। তখন আমাদের বেশ অর্থনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছিল। বিয়ের পর তাই আমি ছোটখাটো একটি চাকরিতে ঢুকে পড়ি। ইউএসআইএস দিয়েই শুরু হয় আমার কর্মজীবন। ১৯৭৭ সালে আমার স্বামী বিদেশে চাকরি পান। মেয়ে তাহমিমাকে নিয়ে তখন আমি স্বামীর সঙ্গে প্রবাসে পাড়ি জমাই। প্যারিসে তখন আমরা টানা পাঁচ বছর ছিলাম। সেই সময়টাতে আমি তেমন কোনো কাজকর্ম করতে পারিনি। তখন আমার চাকরি করার বিষয়ে কিছু বাধা ছিল।
এরপর ১৯৮২ সালে আমরা নিউইয়র্কে যাই। সেটাও স্বামীর চাকরির সুবাদেই। ওখানে গিয়ে আমি সোশ্যাল ওয়ার্কের ওপর মাস্টার্স করি। অনেকদিন পর পড়ালেখা শুরু করতে গিয়ে খুব কষ্ট হয়েছিল। তা-ও বেশ ভালোভাবেই পড়াটা শেষ করি। এরপর আমরা চলে আসি ব্যাংককে। তখন ব্যাপক অর্থে কর্মজীবনে প্রবেশ করি। কাজ শুরু করি জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশন্স হাইকমিশনার ফর রিফ্যুজিসে (ইউএনএইচসিআর)। নারীদের পরামর্শ দেয়ার (কাউন্সেলিং) বিষয়ে আমার পড়াশোনা ছিল। সে কাজটাও এর মধ্যে কিছু করতাম।
এরপর ১৯৯১ সালে আমরা দেশে চলে আসি। মাহফুজ আনাম ‘দ্য ডেইলি স্টার’ পত্রিকা শুরু করেন। আমি ইউএনডিপিতে কাজ শুরু করি। এর মধ্য দিয়েই আমি ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে থাকি। সরকারের মহিলা অধিদপ্তর, কেয়ার-এ কাজ করি। এরপর ২০০২ থেকে এখন পর্যন্ত তো আমি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনে কাজ করছি।
নারীদের কর্মজীবনে দু’ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হয়। এর একটা হচ্ছে পরিবারে, অন্যটা কর্মক্ষেত্রে। চাকরি শেষে ক্লান্ত হয়ে ফিরে নারীদের পরিবারের কাজ করতে হয়। প্রায়ই বাচ্চা অসুস্থ থাকে। এর মধ্যে কাজের জন্য শহর ছেড়ে দূরে যেতে হলে সমস্যা! এটা আমি দেখেছি, দেশের চেয়ে বিদেশেই বেশি সমস্যাজনক হয়। দেশে কাজের লোক পাওয়া যায় সহজে। আমাদের সমাজে পারিবারিক বন্ধনও বেশ শক্তিশালী। ফলে মা বা পরিবারের কাউকে পাওয়া যায় বাচ্চা দেখাশোনার জন্য। বিদেশে এটা নিয়ে খুব ঝামেলায় থাকেন নারীরা। আমি বলব যে, নারীদের কাজের জন্য বাংলাদেশ ভালো একটা জায়গা। তারপরও যুবতী মেয়েদের পরিবার ও কর্ম একসঙ্গে চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সেটা আমারও হয়েছে।
আর কাজের ক্ষেত্রে সাধারণত যা থাকে, নারীদের বেশি কিছু করে দেখাতে হয়। পুরুষের চেয়ে পিছিয়ে নয়, এটা প্রমাণ করতে হয়। নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিতে হয়। নারীদের সুযোগ আসে কম। ফলে যে সুযোগই আসুক, তা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারতে হয়। নইলে এগিয়ে যাওয়াটা কঠিন হয়। আমার ক্ষেত্রে তখন যেটা সুবিধাজনক ছিল, আমার স্বামী আমাকে তখন সব ধরনের সহযোগিতা দিয়েছেন। উৎসাহ দিয়েছেন, সহযোগিতা করেছেন, সাহস দিয়েছেন। আমি মনে করি, ওই শুরুর বয়সে নারী বা পুরুষ, সবার জন্যই ভালো জীবনসঙ্গীর খুব দরকার। পারস্পরিক সহযোগিতার সম্পর্ক না থাকলে ক্যারিয়ার গোছানোর ওই সময়টায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়, যা আর কাটিয়ে ওঠা যায় না। এটা পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও আমার মতে, নারীর জন্য একটু বেশি দরকার পড়ে। কারণ এমনিতেই নারীর জন্য সবক্ষেত্রে বিধিনিষেধ জারি থাকে। সেখানে জীবনসঙ্গী যদি ইতিবাচক না হয়, তাহলে তার জন্য সবকিছুই কঠিন হয়ে পড়ে। এ সময় তাকে বাধ্য হয়ে একটিকে বেছ নিতে হয়।
আমি মনে করি, এই যে একটা বেছে নিতে হবে, এটা ঠিক নয়। একজন তো ভালো ক্যারিয়ার এবং ভালো পরিবার, দুটোই চাইতে পারেন। কেন তাকে একটির দিকে ঠেলে দেয়া হবে। এটাও মানবাধিকার লঙ্ঘন। পুরুষের ক্ষেত্রে কিন্তু এটা তেমন একটা হয় না যে, হয় তুমি সংসার করো, নয় কাজ করো। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে এটা প্রায়ই ঘটে। যখনই সে দুটো চালাতে হিমশিম খায়, কিংবা ধরুন কাজের জন্য বাড়ি ফিরতে একটু দেরি হলো, তখন সবাই নারীকে বলে, তুমি সংসার ভাসিয়ে দিচ্ছ, কাজকে অগ্রাধিকার দিচ্ছ। ফলে নারী তখন এর মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে বাধ্য হয়। এক্ষেত্রে জীবনসঙ্গী যদি সহনশীল এবং সহযোগিতামূলক আচরণ করেন, তাহলে সেটা নারীর জন্য সুবিধাজনক হয়। আমি এই সুবিধাটি পেয়েছি বলে কর্মজীবনে আমাকে কম সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

সাপ্তাহিক:
স্বামীর সহযোগিতার কথা উল্লেখ করলেন। এ পর্যন্ত আসার ক্ষেত্রে আর কারা কীভাবে আপনাকে প্রেরণা জুগিয়েছিলেন?

শাহীন আনাম:
সবার আগে বলতে হবে আমার মায়ের কথা। তার প্রেরণা ব্যতিরেকে আমরা কোথায় থাকতাম তা কল্পনার বাইরে। সব পরিবারেই তাই মায়ের ভূমিকাটি বিরাট ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমার মায়ের নাম ছিল মুসলেহা রহমান। তিনি আমাকে বলতেন, তোমার ভাইরা সাইকেল চালাতে পারে। তোমাকেও পারতে হবে। অনেক কষ্ট করে তিনি আমাদের ইংরেজি মাধ্যমে পড়ালেখা করিয়েছিলেন। আমার বাবা একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি করতেন। আমাদের ছোট ছোট রেখে ১৯৫৯ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সেই তিনি মারা যান। মা একাই লড়াই করে আমাদের এখান পর্যন্ত এসে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা করেছেন।
মায়ের পরে বলব আমার স্বামীর কথা। তিনি যে সব সময় আমাকে এটা ওটা করে দিচ্ছেন বা সাহায্য করছেন, তা কিন্তু নয়। তিনি সব সময় পাশে থেকে বলেছেন, তুমি নিজেই পারবে। আমার মানসিক দৃঢ়তা ধরে রাখা ও বিকাশের ক্ষেত্রে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছেন।
আমার শিক্ষকদের ক্ষেত্রে বলব, বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের শিক্ষক ড. সুলতানা জামানের কথা। তিনি খুবই উঁচু দরের মানুষ এবং একজন ভালো শিক্ষক ছিলেন। তাছাড়া তিনি একজন খ্যাতনামা সমাজ সেবিকাও বটে। তার কাছ থেকে আমি অনেক শিখেছি। এখন তার বয়স হয়ে গেছে। তবু তিনি কাজ করছেন। প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশন, দ্বীপশিখা, এরকম নানা প্রতিষ্ঠানই শুধু নয়, এদেশে মনোবিজ্ঞান অধ্যয়ন ও গবেষণার ক্ষেত্র বিস্তৃতকরণেও তিনি বিরাট ভূমিকা রেখেছেন।
আর আমার এখনকার কাজের যে ধারা, এনজিও খাত। এখানে আমি বলব ড. ফজলে হাসান আবেদের কথা। তাকে আমি আমার পথপ্রদর্শক মনে করি। কারণ যেভাবে তিনি ব্র্যাককে আজ এ পর্যন্ত নিয়ে এসেছেন, তা বিরাট কাজ। অসম্ভব সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে তিনি এখনও লড়ে যাচ্ছেন। অধ্যাপক ইউনূসের কথাও বলতে হবে। এদেশের হতদরিদ্র্য বিরাটসংখ্যক নারীর জীবন মানের উন্নয়নের পেছনে তার ভূমিকা অপরিসীম। আমি তাকে ভীষণ পছন্দ ও শ্রদ্ধা করি।
এরকম আরও অনেকেই আছেন। কতজনের কথা বলব! নারীনেত্রী মালেকা আপা, আয়েশা আপা, রোকেয়া আফজাল রহমান- এরকম অনেকেই আছেন। তারাও আমাকে স্নেহ করেন, সাহস জুগিয়েছেন। আমি তাদের অনেক শ্রদ্ধা করি, ভালোবাসি। এই একগুচ্ছ মানুষের সহযোগিতামূলক ও বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব নিঃসন্দেহে আমার জীবন, মনন গঠনের ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে।
এর বাইরে আমি নিজে সব সময় মানুষের জন্য কিছু করার একটা তাগিদ অনুভব করি। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সমাজকর্ম, নারী, শিশু ও প্রান্তিক মানুষের নানা ধরনের সমস্যা নিয়ে আমি কাজ করতে ভালোবাসি। আমাদের সমাজে মানুষের যে বঞ্চনা, বিশেষত নারীদের, তা আমাকে খুব বিচলিত করে। এই যে নিজের ভেতরের এই তাগিদটা, এটা খুব দরকার। এটা না হলে আবার অন্যদের প্রেরণাও কিন্তু খুব একটা কাজে দেয় না। নিজের ভেতরকার তাগিদ ও কাছের মানুষদের বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব- মানুষের বিকাশের জন্য এই দুটোরই প্রয়োজন পড়ে।

সাপ্তাহিক:
নারীদের এগিয়ে যেতে হলে শত প্রতিকূলতা মোকাবেলা করতে হয়। এতসব প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে টিকে থাকতে গিয়ে নিশ্চয়ই আপনি অনেক কিছু শিখেছেন। এসব শিক্ষা থেকে কিছু বলুন যা থেকে সমাজের অপরাপর নারীরা এগিয়ে যাওয়ার শক্তি পায়।
শাহীন আনাম : প্রথমেই আমি বলব যে, সাহস করতে হবে। একটা বিধিনিষেধের সীমা বা দেয়াল নারীর সামনে সব সময় থাকে। সেটাকে একবারে ভেঙে ফেলা যায় না। বারে বারে সেটাকে ধাক্কা দিয়ে একটু একটু করে এগিয়ে যেতে হয়। যেহেতু সামাজিক কাঠামোর মধ্যেই আমাদের বাস করতে হয়, কাজ করতে হয়। তাই চাইলেই আমরা যেকোনো কিছু করতে পারি না। এরকম একটা অবস্থায় ওই বিধিনিষেদের দেয়ালটাকে আমরা কত জোরে ঠেলা দেব, কতদূর সরিয়ে নেব, তাও একটা ভাবনার বিষয়। এই কৌশলটা আমাদের নারীদের বুঝতে হবে। কতটা ছাড় দিব, আর কোথায় নিজের সিদ্ধান্তের সপক্ষে শক্তভাবে দাঁড়াব, এটা খুব ভালোভাবে নির্বাচন করতে পারতে হবে। সব সময়ই কৌশলের সঙ্গে এগুতে হবে। সাবলীল হতে হবে। যে যেখানে আছেন, সে খাতের নতুন বিষয়াদি সম্পর্কে জানতে হবে। আত্মবিশ্বাস দরকার। আর বিধিনিষেধের সীমা ভাঙার ক্ষেত্রে সতর্ক, সুবিবেচিত ধাক্কা দরকার। কারণ এখানে ভুল হলে সামাজিক প্রতিক্রিয়াটা যেমন হয়, তা মোকাবেলা করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে যায়। সর্বোপরি আমি বলব, নারীকে সাহসী আত্মবিশ্বাসী, উদ্যোগী, কর্মঠ ও সুবিবেচনার অধিকারী হতে হবে। তাহলে তার পক্ষে সব দেয়াল ভেঙে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

সাপ্তাহিক:
প্রতিবাদ? অধিকার আদায়ের লড়াই?

শাহীন আনাম:
তা তো লাগবেই। নইলে নারী শত সংগ্রাম করলেও এগুতে পারবে না। নারীকে অবশ্যই ঘরে, কর্মস্থলে এবং মাঠের সংগ্রামেও নিয়োজিত হতে হবে। এই পুরোটা মিলিয়েই সে নারীবাদী হবে। আমরা কিন্তু ঘর বাড়ি, সন্তান, পরিজন, সমাজ থেকে বেরিয়ে নারীবাদী হইনি। তবে আমরা অবশ্যই নারীবাদী। ইদানীং অনেকে নিজেকে নারীবাদী বলতে ভয় পায়। কিন্তু নারীবাদী বলতে আমরা বুঝাই, নারীর বিরুদ্ধে চলা সকল বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া মানুষকে। নারীবাদের সংজ্ঞা আমার কাছে এটাই। যেহেতু সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা হচ্ছে, এর প্রতিবাদ করতে হবে। আমরা চাই, সমাজ ব্যবস্থাটা এমন হবে, যেখানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই তার মৌলিক অধিকারটুকু ভোগ করতে পারবে। নারীকে এর জন্য কথা বলতেই হবে। সুস্থ সমাজ প্রত্যাশা করেন, এমন সব পুরুষকেও এক্ষেত্রে নারী আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে হবে। সাহসী, আত্মবিশ্বাসী ও প্রতিবাদী হলে নারী সব বাধা অতিক্রম করতে পারবে!

সাপ্তাহিক:
নারী অনেকখানি এগিয়েছে এটা আমরা দেখতে পাই। কিন্তু নারীর তুলনায় রাষ্ট্র ততখানি এগিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। নারী নিজেকে অনেক সীমা ভেঙে ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করলেও রাষ্ট্র এখনও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না। কোথাও দেখা যাবে রাষ্ট্রই বরং নারীর অধিকার রক্ষায় বাধা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের জন্য সান্ধ্য আইনটা নারীর অগ্রসরতার তুলনায় রাষ্ট্রের পিছিয়ে থাকার এটা একটা উদাহরণ। এরকম আরও অনেক বলা যাবে। রাষ্ট্রের এই দুর্বলতার ভিত্তিটা কী?

শাহীন আনাম:
এটা আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র বলেন, সমাজ বলেন, ব্যক্তি বলেন, আমরা সবাই কিন্তু একটি পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি। এখানে হঠাৎ করে সবার মন মানসিকতা পাল্টে যাবে না। হঠাৎ করে রাষ্ট্রও নারীবান্ধব হয়ে যাবে না, এটাই স্বাভাবিক। যত দূর হয়েছে, এটা অনেকগুলো কারণে হয়েছে। বিশেষ করে নারী আন্দোলনের ফলে আমরা আজ এদেশের নারীরা এতদূর অগ্রসর হওয়ার সুযোগ পেয়েছি। এর ফলেই কিন্তু আমরা কতগুলো নারীবান্ধব আইন ও নীতি পেয়েছি। নারীর শিক্ষা, কর্মজীবন, চলাফেরা, নানা ক্ষেত্রেই সুবিধা এসেছে। এই বিজয় দিবসে নারীদের তো আমরা যুদ্ধবিমানও পরিচালনা করতে দেখলাম। আমাদের নারীরা পাহাড়চূড়া জয় করে ফিরছে। এগুলো এমনিতেই হয়ে যায়নি। নারীর এই অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় নানা প্রণোদনার বিরাট ভূমিকা আছে।
তবে রাষ্ট্র যে পিছিয়ে নেই, এটা বলছি না। এটাও ঘটছে সমাজ ব্যবস্থার পশ্চাৎপদতার কারণে। সামগ্রিকভাবে সমাজস্থ সকল সূচকের উন্নতি ব্যতিরেকে রাষ্ট্র এগুতে পারে না। সমাজের নানা ক্ষেত্রে যতদিন আমরা পরিবর্তন না আনতে পারব, ততদিন আমাদের ভুগতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা পেরিয়ে ব্যক্তির আচরণ ও সংস্কৃতি সমেত পরিবর্তন আসতে হবে। নারী যখন মানুষ হিসেবে গণ্য হবে, মর্যাদা পাবে, অবদানের স্বীকৃতি পাবে, স্বাধীনতা পাবে, তখন আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছেছি বলতে পারব। এই পর্যায়ে এখনও আমরা পৌঁছাতে পারিনি। তাই এখনও নারী এগুলেও রাষ্ট্র কোথাও কোথাও তার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠছে।

সাপ্তাহিক:
আপনি তো অনেক দেশে ঘুরেছেন, সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলুন, আন্তর্জাতিক নারী সমাজের তুলনায়, উন্নত সমাজগুলোর নারীদের তুলনায় মৌলিকভাবে আমাদের নারীরা ঠিক কোথায় পিছিয়ে আছে? তাছাড়া কোনো ক্ষেত্রে কি আমাদের নারীরা তাদের চেয়ে এগিয়ে আছে বলে আপনার মনে হয়েছে?

শাহীন আনাম:
আমাদের নারীরা প্রধানত ব্যক্তিগত জীবনে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এখনও উন্নত সমাজগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। শহর দেখে বিবেচনা করলে হয়তো এটা ভালো বোঝা যাবে না। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতি এটাই। অধিকাংশ নারী এখনও এই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না যে, সে কখন বিয়ে করবে, কাকে বিয়ে করবে! এগুলোর জন্য তাকে পরিবারের সিদ্ধান্তই অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেনে নিতে হয়। কতগুলো সন্তান নিবে, এটাও তার হাতে থাকে না। অর্থাৎ এমনকি নিজের শরীরের ওপরও তার নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। এর বাইরে আমাদের বিচার ব্যবস্থা এখনও নারীবান্ধব নয়। নারী যখন বিচার চাইতে যায়, তখন তাকে অনেক ধরনের ঝামেলায় পড়তে হয়। এরপর বিচারপ্রার্থী নারীদের কয়জন বিচার পাচ্ছে, তার হিসাবটা দেখেন। এই জায়গাগুলোতে আমরা পিছিয়ে আছি।
আমরা তাদের চেয়ে এগিয়ে না থাকলেও কিছু কিছু জায়গায় তাদের কাছাকাছি বা সমতায় পৌঁছেছি। শিক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের নারীরা তো এখন পুরুষদের সমকক্ষ। তাদের চেয়ে কম নয়। এই জায়গায় আমরা এগিয়েছি বলা যায়। আরেকটা জায়গায় আমরা এগিয়ে আছি, যদিও এটার ভালো-মন্দ, দুই দিকই আছে। এটা হচ্ছে পারিবারিক বন্ধন। ভারতবর্ষীয় সমাজের এটা একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্যও এখানে পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন বেশ শক্তিশালী। ফলে নারীরা কিছু বাড়তি সুবিধা পায়, আমার নিজের উদাহরণ দিয়ে যা আগেই বলেছি। ইউরোপের কর্মজীবী নারীদের সমস্যা আমাদের তুলনায় বেশি, এটা আমি দেখেছি। তাই পারিবারিক এই বন্ধনটাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তবে এক্ষেত্রে আশঙ্কার জায়গা হচ্ছে, পরিবারের হাতে সব ছেড়ে দেয়াটা! নারীকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্তগুলো সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারতে হবে।

সাপ্তাহিক:
ধর্মীয় মৌলবাদের বিকাশ আমরা দেখতে পাচ্ছি। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র নারীকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, এখানে রাষ্ট্রের কী ধরনের উদ্যোগ দরকার? নারীর নিজের করণীয় কী?

শাহীন আনাম:
রাষ্ট্রের করণীয়টা পরিষ্কার। নারী যে সব ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ছে, নারীর অধিকার যেসব জায়গায় ক্ষুণœ হচ্ছে, সেগুলোর প্রতিকার করতে পারে। আইন করতে পারে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারে। এখনও অনেক বৈষম্যমূলক আইন রয়ে গেছে, সেগুলো দূরীভূত করার উদ্যোগ নিতে পারে। বিচার ব্যবস্থাকে আরও নারীবান্ধব ও শক্তিশালী করতে পারে। প্রত্যেক ক্ষেত্রে নারীর জন্য সুযোগ করে দিতে পারে। নারী যেন স্বাস্থ্যসেবা সঠিকভাবে পায়, তার কর্মসংস্থানটা যেন ভালো জায়গায় হয়, এভাবে তার বিকাশের ব্যবস্থা করতে পারে।
আর নারীর করণীয় তো অনেক। প্রথমেই নারীকে তার আশপাশের নারীদের নিয়ে সংঘবদ্ধ হতে হবে। নারী যখন পূর্ণবয়স্ক, তখন তার অধিকারগুলো সচেতন হতে হবে। মৌলবাদীরা ধর্মকে ব্যবহার করে নারীকে ঘরে বন্দী করার ফন্দি করে! নারীকে এই জাল ছিন্ন করতে হবে। ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়, এটা নিয়ে অন্যের মাতুব্বরি মেনে নেয়া যাবে না। এছাড়া আমার অভিজ্ঞতা বলে যে, নারী যত বেরিয়ে আসবে, তত সে সুবিধা পাবে। যতখানি সে ঘরে ঢুকবে, ততখানি জায়গাই তার প্রতিপক্ষরা দখলে নিয়ে নেবে। ব্যাংককের মতো শহরে গেলে আপনি দেখবেন চারদিকে নারী। সেখানে রাস্তায় নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ দেখানোটা সহজ নয়। তাই আমি মনে করি, নারীর চলাফেরা বাড়ানো দরকার। এতে বাধা আসলে তা রুখে দাঁড়ানো দরকার। নারী যদি বেরিয়ে আসে আর রাষ্ট্র যদি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাহলে এই সমস্যা মোকাবেলা করা যায়।

সাপ্তাহিক:
আমার তো মনে হয়, ধর্ম শিক্ষা ব্যবস্থাপনার মধ্যেই এর বীজ রয়েছে। কারণ নারী নীতির বিরোধিতা যারা করেছিলেন, তারা মাদ্রাসা ছাত্রদের পথে নামিয়েছিলেন। আর এই ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে নারীরা যাচ্ছেন, তাদের অবস্থা তো আরও গুরুতর! সেক্ষেত্রে ধর্মশিক্ষা ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন না আনলে কি রাষ্ট্র নারীর বিরুদ্ধে জারি থাকা ধর্মীয় গোঁড়ামির কোনো অবসান ঘটাতে পারবে?

শাহীন আনাম:
অবশ্যই আমি মনে করি, ধর্মশিক্ষায় সংস্কার আনা দরকার। তা বন্ধ করার কথা আমি কিছুতেই বলছি না। আমার মতে, এই ব্যবস্থাটার ব্যাপক আধুনিকায়ন প্রয়োজন। মাদ্রাসাগুলোর কিন্তু গুরুত্ব আছে। আমি সবাইকে বলি গ্রামের গরিব বাচ্চাদের বা শহরের ভাসমান শিশুদের শিক্ষার দায়িত্বটা কি আপনি বা আমি নিয়েছি? ওটা কিন্তু সেই মাদ্রাসার কল্যাণেই হচ্ছে! এটা স্বীকার করতেই হবে যে, তারা একটি সামাজিক দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু সেই দায়িত্বটা কীভাবে পালন করছে, ওখানে কী শেখানো হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণের আওতায় আনা দরকার এবং রাষ্ট্রের এ দায়িত্বগুলো বুঝে নেয়া দরকার। এটা একেবারেই হচ্ছে না।

সাপ্তাহিক:
নারীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাচ্ছি, রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনাদের পরিকল্পনা কী? কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নারী এগিয়ে যেতে পারে?

শাহীন আনাম:
আমাদের কর্মকাণ্ড তিনটি ভাগে বিভক্ত। মাঠে আন্দোলন, সরাসরি মানুষের মধ্যে প্রচার ও নীতি প্রণয়নে সরকারের সঙ্গে কাজ করা। এর মধ্য দিয়েই আমরা কিছু অর্জন করেছি। আবার অনেক ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়েও আছি। এই যে ধরুন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইন হলো এটাও কিন্তু আমাদের একটা অর্জন। আমি মনে করি, এই তিনটি কাজই আমাদের করতে হবে। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আমরা নিজেদের বিপন্ন করব। তা না করে বরং সমাজকে পক্ষে টানতে হবে। গঠনশীল উপায়ে ধীরে ধীরে আন্দোলন, প্রচার ও সরকারকে নীতি পরিবর্তনে উদ্বুদ্ধ ও বাধ্য করার ধারাবাহিক কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই নারীসমাজ এ চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করতে পারে।

সাপ্তাহিক:
নারী অধিকার নিয়ে আন্দোলনে কিন্তু আমরা ভাটা দেখতে পাচ্ছি। নারী সংগঠনগুলোর মাঠে উপস্থিতি নেই! একজন সাংসদ একজন নারী মেয়রকে গালি দিলেন। এটার প্রতিবাদ হলো না। এটা কি নারীর ক্ষমতায়নকে পিছিয়ে দেয়া নয়? নারী আন্দোলনের আজকের বেহাল দশার কারণ কী? এক্ষেত্রে করণীয় কী?

শাহীন আনাম:
আমি বলব না যে, আন্দোলন থেমে গেছে। এটা মাঝে মাঝে গতি পায়, মাঝে মাঝে আস্তে ধীরে আগায়। আর কিছু কাজ যে হচ্ছে না, তা নয়। তবে আপনিও যে একেবারে ভুল বলছেন, তা বলছি না। আন্দোলনের গতি এখন সত্যি কম। নারী সংশ্লিষ্টদের এক্ষেত্রে আরও তৎপর হতে হবে।

সাপ্তাহিক:
এবার আরেকটু গভীরে যাই। নারী অধিকারের ক্ষেত্রে কোথাও অর্জন আছে, কোনোটা নিয়ে আলাপ হচ্ছে। কিন্তু নারীর গৃহশ্রমের মূল্যায়ন কোথাও নেই। পরিবারে নারী ও পুরুষ দুজনে শ্রম দিলেও নারীর শ্রম উপেক্ষিত। তাহলে সমতা আসবে কীভাবে? এক্ষেত্রে করণীয় কী?

শাহীন আনাম:
আপনারা হয়তো জানেন যে, আমরা একটি প্রচারাভিযান শুরু করেছি। এর নাম দেয়া হয়েছে, ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য দূরীভূত করা। আমরা এটা করছি অনেক অভিজ্ঞতার আলোকেই। দীর্ঘদিন ধরে আমরা উন্নয়ন সংগঠন, মানবাধিকার নিয়ে কাজ করে আসছি। এর মধ্যে নারীর অধিকার আদায়ের জন্য নানা ধরনের কৌশল প্রণয়ন করছি, তা বাস্তবায়ন করছি। আজ এখানে এসে আমরা ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ এই কাজটি হাতে নিয়েছি। আমরা মনে করছি, এর মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্যের মূল কারণটাকে দুর্বল বা বিনাশ করা যাবে।
আমরা দেখেছি সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্যের সুযোগ তৈরি হয় তার পুরুষের সমান মর্যাদা না থাকার কারণে। যে নারীর মর্যাদা আছে, তার প্রতি বৈষম্য দেখানোর সুযোগ কম। এখন এই মর্যাদা কীভাবে আসে? নারী কীভাবে মর্যাদা অর্জন করতে পারে। আমরা দেখেছি, সমাজে মর্যাদা তৈরি হয় কে কতটুকু অবদান রাখছে তার ওপর ভিত্তি করে। তার মানে নারীদের পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে যথেষ্ট অবদান রাখতে হবে।
এখন আমরা যদি দৃষ্টি দেই, তাহলে দেখব যে, পুরুষরা বলবে আমরা কাজ করি, সমাজ গড়ি, পরিবার গড়ি। একই কাজ কিন্তু নারীও করে। সেও টানা শ্রম দেয়- গৃহশ্রম। একজন পুরুষ হয়তো এই কাজই, ধরুন রান্নার কাজ করেই সে টাকা আয় করে। কিন্তু নারীর এই শ্রমের কোনো দাম আমাদের সমাজে নেই।
এরপর দেখবেন নারী সন্তান লালন পালন করছে। সন্তানকে প্রাথমিক শিক্ষা দিচ্ছে। সন্তানকে আরও অনেক কিছু শেখাচ্ছে। ঘরের বাইরে এই প্রতিটি কাজের জন্যই অনেক টাকা দেয়া হয়। কিন্তু কোটি কোটি নারী ঘরে এই শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন, কোনো মূল্য ছাড়াই।
এরপর দেখেন কৃষি বা শিল্পের দিকে। কৃষিতে ফসল মাঠে যাওয়া, সেখান থেকে বাড়িতে এসে খাদ্যপণ্যে প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত বিরাট একটা কাজের ভারই কিন্তু নারীর। পুরুষ তার মাঠের কাজের টাকা পায়। কিন্তু নারীর শ্রমটাকে মনে করা হয় গৃহস্থালির অংশ। যিনি নতুন শিল্পোদ্যোক্তা, দেখবেন তার পরিবারের নারীটি ওই শিল্পের গোড়াপত্তনে বিরাট শ্রম দিচ্ছেন। কিন্তু তার কোনো পাওনা নেই।
এর অর্থ কী? নারীর অনেক অবদান আছে। কিন্তু সেসব অবদানকে কাজ মনে করা হয় না। মূল্যায়ন করা হয় না। এজন্যই শ্রম দিয়েও সে উপেক্ষিত। কিছুই পাচ্ছে না। এটা নিয়ে এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আলাপ হচ্ছে। ভারতের একটি রাজ্যে তো নারীদের গৃহশ্রমের জন্য মাসোহারা দেয়ার নিয়মও হয়েছে। যদিও তা বাধ্যতামূলক নয়। আমরা টাকা দিতে হবে, এটা বলছি না। কিন্তু আমরা বলছি যে, নারীর এই অবদানকে হিসাবে নিতে হবে। সে যে এই অবদান রাখছে, এটা স্বীকার করতে হবে রাষ্ট্রকে। নারীর শ্রমের অর্থমূল্যটা প্রকাশ পেলে তো নারী বলতে পারবে যে, আমি এতটা করেছি, আমারও অবদান আছে। আর অবদান নিশ্চিত হলেই মর্যাদার ভিত্তি তৈরি হবে। যার প্রেক্ষিতে সমতার দাবি আরও শক্ত ভিত্তি পাবে। এটা নিয়ে আমরা নানামুখী কাজ করছি। এর মাধ্যমে নারীদের জন্য আশা করি কিছু করতে পারব।

সাপ্তাহিক:
অর্থমূল্যটা কীভাবে ঠিক হবে, এটা কি ভেবেছেন? রাষ্ট্রই বা কীভাবে এর স্বীকৃতি দিবে?

শাহীন আনাম:
তা করা হয়েছে। এগুলো করেই আমরা কাজ শুরু করেছি। বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) মাধ্যমে আমরা একটি গবেষণা করিয়েছি। সেখান থেকে এই হিসাবগুলো কেমন হবে না হবে তার প্রস্তাবনা এসেছে। অনেক মানুষের মধ্যে জরিপ চালানো হয়েছে। নারীদের জিজ্ঞেস করা হয়েছে যে, আপনি কি মনে করেন, আপনার এই কাজের পারিশ্রমিক কত হতে পারে। আবার তাদের মতের পাশাপাশি বাজারে এই শ্রমের দাম কত তা-ও হিসাব করা হয়েছে। রাষ্ট্র এই হিসাবটা চূড়ান্ত করে এটাকে জিডিপিতে দেখাবে। আমরা এভাবেই ভাবছি। এর মধ্যে মন্ত্রীসহ সরকারের নানা পর্যায়ের লোকদের সঙ্গে আমাদের মতবিনিময় হচ্ছে। সরকার ও মাঠপর্যায়ের মানুষ সবাইকে নিয়েই আমরা এগোচ্ছি। আশা করছি, নারীর গৃহশ্রমের মূল্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারলে আমরা সমাজে তার মর্যাদা এবং সমতা নিশ্চিত করতে পারব। এ কাজে আমরা সবার সাহায্যও চাইছি।

সাপ্তাহিক:
আমার সর্বশেষ প্রশ্ন হচ্ছে, একজন সফল মানুষ হিসেবে আপনি নিজে এই রাষ্ট্রের অংশীদার। নিজে সফল হলেও আমাদের রাষ্ট্রটা কি সফল হয়েছে? কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে করণীয় কী?

শাহীন আনাম:
আমি মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম। আমরাই দেশ স্বাধীন করেছি। আমাদের চেতনা ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হবে। বৈষম্য ও শোষণ থাকবে না। নাগরিকের সম-অধিকার থাকবে। সেখান থেকে আজ আমরা অনেকখানি পিছিয়ে এসেছি। তাই মুখে চেতনার কথা না বলে, যে বিশ্বাস নিয়ে আমরা লড়াই করেছিলাম, তার বাস্তবায়ন করা দরকার। কিন্তু এটা করা বা পুরো বিষয়টা বোঝা যে, আমরা পারছি না, কোথাও আটকে গেছি- এখানে আমাদের প্রজন্ম ব্যর্থ হয়েছে। আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। আমার আহ্বান, আমাদের সবাইকে নিয়েই এগুতে হবে। জিডিপির হিসাব দেখিয়ে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র আমরা বলতে পারি। কিন্তু তাতে সমতা নিশ্চিত হবে না। সমতা প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের সবার সক্রিয়তা দরকার। সমাজে প্রত্যেকের মর্যাদা নিশ্চিত হওয়া দরকার।