সমান সমান

মর্যাদায় গড়ি সমতা

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) মানবাধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে। বিশেষ করে কাজ করছে সুবিধাবঞ্চিত ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীর জীবনে পরিবর্তন সাধন এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য।
এমজেএফ এর মূল কর্মসূচী চারটি- এগুলো হলো:

১. নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ;

২.প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আর্থ সামাজিক উন্নয়ন;

৩.শ্রমিকের অধিকার রক্ষা ও শিশুদের সুরক্ষা;

৪.জনসেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি করা। এম জে এফ মূলতঃ বিভিন্ন এনজিও ’র সাথে পার্টনারশীপের ভিত্তিতে কাজ করে এবং তাদের তহবিল ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।

গত ৪৩ বছরে বাংলাদেশ কন্যা ও নারী শিক্ষার প্রসার, মাতৃ মৃত্যুর হার হ্রাস এবং কাজের সুযোগ তৈরীতে অসাধারন অগ্রগতি সাধন করেছে। ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মধ্যম পর্যায়ের নারী উদ্যোক্তা তৈরী হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণীর মাধ্যমে জাতীয় পর্যায়ে ঋণদান প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছে। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন ও নারী পুরুষের বৈষম্যের ফলে সৃষ্ট নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে প্রনীত হয়েছে সুনির্দ্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা। আজ বাংলাদেশে এমন কোন ক্ষেত্র নেই যেখানে নারীর উপস্থিতি চোখে পড়ে না এবং যেখানে নারী কোন অবদান রাখেনি।
এতো অর্জন সত্ত্বেও বাংলাদেশে নারীরা প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ধরনের বৈষমের শিকার হচ্ছে এবং তাদের পুরুষের অধঃস্তন পর্যায়ে রাখা হয়েছে। সমাজে নারীদের এই অধঃস্তন অবস্থান দেখানোর ফলে নারী ও কন্যা শিশুরা প্রতিনিয়ত সহিংসতার শিকার হচ্ছে এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তাদের মৃত্যুও ঘটে থাকে।

সমস্যা চিহ্নিতকরণঃ
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে জাতীয়, স্থানীয় এবং পারিবারিক পর্যায়ে নারীর অবদানকে কখনোই সঠিকভাবে মূল্যায়ণ করা হয়নি বা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। দেয়া হয়নি যথাযোগ্য মর্যাদা। নারীর প্রতি সমাজে যে ধ্যান ধারনা বা প্রচলিত বিশ্বাস তা হচ্ছে যে নারীরা নির্ভরশীল, পরিবারের বোঝা । নারীর অবদানের এই অস্বীকৃতি বা অবমূল্যায়ণই সমাজে নারীর নি¤œ পর্যায়ে অবস্থানের কারন। এর ফলে নারী ব্যক্তি, পারিবারিক ও জনজীবনে বৈষম্যের ও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।

নিম্নে উল্লেখিত মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও সিপিডি’র এক যৌথ গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায় পরিবার ও সমাজে নারীর অবস্থান কতটা অবমূল্যায়িত, অসংরক্ষিত এবং কখনই বিস্তৃত পরিসরে নারীর অবদানকে উপস্থাপন করা হয় নি। যেমনঃ

সময় ব্যবহার:

  • ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের একজন নারী গড়ে প্রতিদিন একজন (১৫ বা তদূর্ধ্ব বয়সের) পুরুষের তুলনায় প্রায় তিনগুণ সময় জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না এমন কাজে নিয়োজিত থাকে।
  • প্রতিদিন একজন নারী এ ধরনের কাজে গড়ে ৭.৭ ঘন্টা ব্যয় করে– অন্যদিকে এ ধরনের কাজে একজন পুরুষের গড়ে সময় ব্যয় হয় মাত্র ২.৫ ঘন্টা।
  • গ্রাম ও শহর– দু’এলাকাতেই এ ব্যবধান স্পষ্ট।

কাজের সংখ্যা:

    • একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২.১টি এমন কাজ সম্পন্ন করে যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। পুরুষের ক্ষেত্রে এ ধরনের কাজের সংখ্যা ২.৭টি।

মূল্য নিরূপণ:

  • সিডিপি’র খানা জরিপ অনুসারে, প্রতিস্থাপন পদ্ধতি (কাজের মূল্য ব্যবহার করে) অনুযায়ী, নারীদের সম্পন্ন করা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না এমন কাজের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য (২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের) জিডিপি’র প্রায় ৭৬.৮% এর সমপরিমাণ।
  • অনুরূপভাবে, গ্রহণযোগ্য মূল্য পদ্ধতি (খানার বাইরে) অনুযায়ী, উপরোক্ত কাজের প্রাক্কলিত বার্ষিক মূল্য (২০১৩-২০১৪ অর্থবছরের) জিডিপি’র প্রায় ৮৭.২% এর সমপরিমাণ।
  • উপরোক্ত কাজের মূল্যমান নারীদের লব্ধ মোট আয়ের (সিপিডি’র খানা জরিপ থেকে প্রাক্কলিত) ২.৫ থেকে ২.৯ গুণ।

প্রচারাভিযানের যৌক্তিকতাঃ
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, যদি নারীরা তাদের যথাযোগ্য মর্যাদা এবং কাজের স্বীকৃতি না পায় তাহলে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অপূর্ন থেকে যাবে এবং জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্য মাত্রা অর্জনও বাধাগ্রস্থ হবে।
১৯৯৫ সনে বেইজিং এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর অবদান সঠিকভাবে চিহ্নিতকরণ এবং নারীর পরিপূর্ন সময় ও কাজের পরিমান সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে দৃশ্যমান করার উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সাথে গৃহস্থালী বিভিন্ন কাজেরও মূল্যায়নের উপর জোর দেয়া হয়। বিশেষ করে নারীদের উপর নির্ভরশীল শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের সেবাযত্ম ও সমন্বিত জ্ঞানকে মূল্যায়ন ও ক্ষেত্র সমূহকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।

তাছাড়া, নারীর অবদানের যে অর্থমূল্য ধরা হয় না তার গুরুত্ব তুলে ধরা হয় দারিদ্র বিমোচন কৌশল পত্রে। বাংলাদেশে নারী উন্নয়ন নীতি অনুযায়ী নারীর অগ্রযাত্রা ও অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে অর্থনীতির মূল  নারীর অবদানের স্বীকৃতির বিষয়টি অর্ন্তভূক্তির কথা বলা হয়েছে।
এমজেএফ গভীরভাবে বিশ্বাস করে যে, পরিবার ও সমাজে নারীর অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক সকল কাজের মূল্যায়ণ হলে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং ফলশ্রুতিতে-

  • নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতার পরিমান কমে আসবে
  • নারীবান্ধব আইন ও নীতিমালা প্রনীত হবে
  • সমাজ ও জাতীয় অর্থনীতিতে পুরোমাত্রায় নারীর শক্তি বা অবদানের সুযোগ বা সুবিধা নিতে পারবে
  • সহ¯্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক হবে

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন মনে করছে জাতীয়ভাবে এসব বিষয় তুলে ধরার মাধ্যমে একটি নির্দ্দিষ্ট সময় ধরে প্রচারাভিযান চালালে নারীর প্রতি মানুষের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তনে সহায়ক হবে, নারী অ-অর্থনৈতিক কাজের স্বীকৃতি পাবে এবং নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অবস্থান পরিবর্তন হবে এবং মর্যাদা বৃিদ্ধ পাবে।

প্রচারাভিযানের লক্ষ্যঃ
সমাজে নারীর প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করার মাধ্যমে পরিবারে ও সমাজে নারীর অবস্থান ও মর্যাদা বৃদ্ধি করা বা উন্নত করা।

প্রচারাভিযানের সুনির্দিষ্ট ও প্রাসঙ্গিক উদ্দেশ্যঃ

  • পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর গুরুত্বপূর্ন অবদান বিষয়ে ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা।
  • অর্থনীতিতে নারীর কাজের অস্বীকৃতি বা অব-মূল্যায়ণকে গুরুত্বের সাথে চিহ্নিত করা ।
  • নারীর অবদানের অব-মূল্যায়ণের ফলে জিডিপিতে নেতিবাচক যে প্রভাব পড়ে এবং এই প্রভাব জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে যে ব্যাঘাত ঘটায়, সেই দিকটি পরিকল্পনাবিদ ও নীতি নির্ধারকদের কাছে তুলে ধরা।
  • নারীর প্রতি প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে ইতিবাচকভাবে নারীদের উপস্থাপনের জন্য গনমাধ্যম, বিজ্ঞাপনী প্রতিষ্ঠান ও প্রাইভেট সেক্টরকে সংবেদনশীল করা।

প্রচারাভিযান বাস্তবায়ন কৌশলপত্রঃ
প্রচারাভিযানটি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং এর ১১৩টি সহযোগী সংগঠন দ্বারা পরিচালিত ও বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রচারাভিযানের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সহযোগী সংগঠন গুলো স্ব স্ব সংগঠনের নিজস্ব কর্ম -এলাকায় এই কর্মসূচী পরিচালনা করবে।
নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় মন্ত্রণালয় তার আওতাধীন সকল বিভাগ ও দপ্তরকে এ কাজে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহন করেছে এবং প্রচারাভিযানকে সফল করার জন্য সক্রিয় থেকে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করবে।
এই প্রচারাভিযানের লক্ষ্যিত জনগোষ্ঠী সাধারন মানুষ, একটি নির্দ্দিষ্ট বয়সের নারী ও পুরুষ, বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নীতি নির্ধারকবৃন্দ ও গনমাধ্যম প্রত্যেকেই কৌশলগতভাবে এই প্রচারাভিযানে অর্ন্তভূক্ত হবেন।


প্রাথমিক ভাবে মূলতঃ তিনটি কর্মসূচীর কথা ভাবা হয়েছেঃ

  • দেশব্যাপী জন সচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ
  • নারীর অর্থনৈতিক ও গৃহস্থালী কাজে অবদান বিষয়ে গবেষণা
  • নারীর অবদানকে স্বীকৃতি ও জিডিপিতে অন্তর্ভূক্তির জন্য এ্যাডভোকেসী করা।

প্রচারাভিযান পরিচালনার সময় প্রাথমিকভাবে ৩ বছর ।
গণমাধ্যমকে বিশেষ সহযোগী ও চ্যাম্পিয়ন হিসেবে এই প্রচারাভিযানের সাথে দেখার পরিকল্পনা।

নারীর কাজের গুরুত্ব ও আর্থিক মূল্যায়ন করা হলে নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার আশানুরূপ পরিবর্তন আসবে। বাংলাদেশ সরকার জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর কাজের অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে বিশ্বে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। গৃহস্থালী ও অর্থনৈতিক কাজে নারীদের অবদানকে যদি মূল্যায়ন করা হয় তাহলে পরিবার , সমাজ ও রাষ্ট্র সকল ক্ষেত্রে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। পুরুষরা নারীদেও কাজের মূল্য ও গুরুত্ব বুঝতে পারবে এবং নারীদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে। এই অবদানকে জাতীয় অর্থনীতিতে মূল্যায়নের লক্ষ্যে জনগণ ও নীতি নির্ধারকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, এর মূল্য জিডিপি’তে অর্ন্তভূক্ত, এবং এ বিষয়ে সরকারী-বেসরকারী পর্যয়ে কার্যক্রম গ্রহন করা প্রয়োজন। যার ফলে সামগ্রিকভাবে নারীর প্রতি বৈষম্যের হার কমে আসবে। নারী পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠার পথ সহজ হবে। সর্বোপরি নারী মর্যাদার সাথে পরিবার ,রাষ্ট্র ও সমাজে আরো এগিয়ে যাবে এবং সমগ্রিকভাবে নারীর অবস্থানের পরিবর্তন হবে।