১। ” মর্যাদায় গড়ি সমতা ” প্রচারাভিযান কেন?

অধিকার ও সমতার ভিত্তিতে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সমাজের সব শ্রোণীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গী- পরিবর্তনের জন্য ” মর্যাদায় গড়ি সমতা ” শীর্ষক প্রচারাভিযানটি যাত্রা শুরু করেছে। জেন্ডার ইস্যু নিয়ে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মঅভিজ্ঞতার মাধ্যমে বের হয়ে এসেছে যে- রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারে নারীর যে ভ’মিকা ও অবদান রাখছে বিশেষ করে নারীর গৃহস্থালি কাজ বা অ-অর্থনৈতিক কাজ তা সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি এবং মূল্যায়নও করা হয়নি।

 

নারীর প্রজনন ও উৎপাদনশীল ভূমিকা ও অবদান সবসময় অবমূল্যায়িতই রয়ে গেছে, বরং প্রচলিত প্রথাগত ধারণা থেকে মনে করা হয় যে নারী অন্যের উপর নির্ভরশীল এবং পরিবার ও সমাজের কাঁধে বোঝাস্বরূপ ।আর এই ধারণা পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে নারীর প্রতি বৈষম্য ও পুরুষের তুলনায় নারীর অধস্তন অবস্থানকে নিশ্চিত করে।

 

কিন্তু যদি উন্নয়নের চাকাকে গতিশীল করতে হয়, তাহলে কোনভাবেই নারীর অর্থনৈতিক ও অ-অর্থনৈতিক কাজ ও অবদানকে অবজ্ঞা করা যাবে না। এই অবস্থার প্রেক্ষিতে নারীদের অবদানের কথা তুলে ধরে দেশব্যাপি প্রচারণা চালানো হলে তা মানুষের মনে বড় ধরণের পরিবর্তন আনতে এক নতুন মাত্রা যুক্ত করবে । জেন্ডার সমতা, নারীর ভূমিকা ও নারীর গৃহস্থালি কাজ সম্পর্কে মানুষের মনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করবে ।যার ফলে নারীর সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে ।

 

২। এই প্রচারাভিযানের মূল লক্ষ্য কী ?

নারীর প্রতি সমাজে বিদ্যমান ধারণার পরিবর্তন করার মাধ্যমে ব্যক্তিগত জীবনে এবং সমাজের সবক্ষেত্রে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা, যা নাকি নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা কমাতে সহায়তা করবে।

৩। এই প্রচারাভিযানের মূল বার্তাগুলো কী কী ?
  • পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে নারীর অবদান গুরুত্বপূর্ণ
  • মজুরী এবং মজুরীবিহীন – উভয় কাজের মাধ্যমে নারী দেশের জিডিপি-তে অবদান রাখছেন
  • নারীর ভূমিকা ও অবদান বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত বিনিময়
  • জেন্ডার সমতা’র প্রয়োজনীয়তা
  •  নারীর ক্ষমতায়নে পুরুষের ভূমিকা
  • কাজের স্বীকৃতি ও সমমর্যাদার বিষয়ে নারীর অধিকার
৪। পুন:উৎপাদনমূলক ভূমিকা (Reproductive Role) বলতে কী বোঝানো হয় ?

পুন:উৎপাদনমূলক ভূমিকা বা কাজ মূলত: মজুরী বা পারিশ্রমিক বিহীন। এ সব কাজের কোন বিনিময় মূল্য নেই বলে তা স্বীকৃতিহীন । আবার এই কাজগুলো যখন কেউ কোন অর্থের বিনিময়ে বা দ্রব্যের বিনিময়ে করে তখন তা উৎপাদনমূলক ভূমিকা হিসাবে গন্য করা হয় । পুন:উৎপাদনমূলক কাজ সমূহ যেমন : অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সম্পত্তি বা প্রজন্মের লালন পালন সহ যাবতীয় গৃহস্থালী কাজ (রান্না-বান্না,ধোয়ামোছা, মাজাঘষা, ঘরদোর পরিষ্কার করা, পানি ও খড়ি সংগ্রহ ইত্যদি) নারীর উপরই চাপিয়ে দেয়া হয়েছে এবং এর রয়েছে দীর্ঘ পুরুষতান্ত্রিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট । সূতারাং নারীর এইসব স্বীকৃতিহীন কাজ – সন্তান ধারন, লালন পালন যাবতীয় গৃহস্থালী কাজই হলো পুন:উৎপাদনমূলক ভূমিকার কেন্দ্রীয় বিষয়।

৫। লিঙ্গীয় সমতা ও ন্যায্যতা (Gender Equality & Equity) কী ?

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সকলক্ষেত্রে নারী পুরুষ উভয়ের সমান দৃশ্যমানতা, সমান অংশগ্রহন, সমান ক্ষমতায়ন, সমান সম্মান মর্যাদাই হলো জেন্ডার সমতা। এবং তা হতে হবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনেও। সুতরাং সমতা শব্দটি সকল ক্ষেত্রে নারী-পূরুষের সমান অধিকার, সমান সুযোগ-সুবিধা, সমান অবস্থা ও অবস্থান, সমান আচার- আচরন নিশ্চিত করে। শুধুমাত্র নারীর জৈবিক বা প্রজনন স্বাস্থ্যগত ভূমিকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠে নারীর প্রতি বৈষম্য, সহিংসতা ও অমর্যাদা অব্যহত থাকতে পারে না। যা নারীর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সামিল।

 

কিন্তু নারী পুরুষের মধ্যে সমতা হবে ন্যায্যতা বা সাম্যতার ভিত্তিতে। সুতরাং সমতা অর্জনের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। সাম্যতা সেজন্য ন্যায্যতাকে প্রকাশ করে। কারণ ন্যায্যতা এমন একটি প্রক্রিয়া যা সমাজের অসমতা সৃষ্টিকারী বা বৃদ্ধিকারী দিকগুলির সংশোধন বা নিরোধের নীতি প্রয়োগ করে এবং সমতার উপর গুরুত্বারোপ করে। সাম্যতা বা ন্যায্যতা হলো প্রক্রিয়া, সমতা হলো ফলাফল । সুতরাং নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করার জন্য নারীকে অবস্থা-অবস্থান সংস্কৃতি ভেঙ্গে যেখানে যা প্রয়োজন তা চিহ্নিত করার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ।

 

৬। পিতৃতন্ত্র (Patriarchy) কী ?

পিতৃতন্ত্র বা পুরুষতন্ত্র একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ মানে মূল কথা একই। আক্ষরিক অর্থ হলো পিতা বা পরিবার প্রধান কোন ব্যক্তির কর্তৃত্ব, ক্ষমতা প্রদর্শন ও নিয়ন্ত্রন। এই পিতৃতন্ত্র নানান কায়দায়- ব্যবস্থায় নারীদেরকে তাদের অধীনস্ত করে রাখতে চায় বা রাখে। নারীবাদী জুলিয়েট মিচেলের মতে, পিতৃতন্ত্র এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে পুরুষ নারীকে বিনিময় দ্রব্য বা পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি আরও মনে করেন এই পিতৃতন্ত্র বা সামাজিক ব্যবস্থার এক ধরনের প্রতীকি ক্ষমতা থাকে এবং এই ক্ষমতাই নারীর অধঃনস্ত অবস্থা সৃষ্টির জন্য দায়ী।

 

অন্য এক নারীবাদী তাত্ত্বিক সিলভিয়া’র ব্যাখ্যায় পিতৃতন্ত্র সামাজিক কাঠামো আর রীতিনীতি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে নারীকে ব্যবহার, শোষণ আর নিয়ন্ত্রন করে পুরুষ। এই মতাদর্শে বিশ্বাসী পুরুষ নিজেদেরকে নারীর তুলনায় শ্রেষ্ঠ ও শক্তিশালী মনে করে- নারীর উপর পুরুষের আধিপত্যকে অনুমোদন করে এবং নারীকে পুরুষের সম্পত্তি বলে গণ্য করে।

 

নারীর এই অবস্থা ও অবস্থান বিভিন্ন সমাজে এবং ইতিহাসে ভিন্ন ভিন্ন রুপে দেখা যায়। এমন কি সমাজে শ্রেনী, ধর্ম, জাতিভেদেও পার্থক্য হয়। কিন্তু মূল মর্মার্থ -নারীর উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রন, কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা প্রকাশ বিষয়টি বিশ্বব্যাপী এক। কারন আদিম সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থায় উৎপাদন ও কৃষি সভ্যাতার সাথে সাথে এর পরিবর্তন শুরু হয়েছে-যা দাস, সামন্ত, পুঁজিবাদ সকল সমাজ ব্যবস্থাতেই নানারুপে পিতৃতন্ত্র বহাল থেকেছে। আমাদের সমাজে দেখতে পাই ছেলে সন্তানের আকাঙ্খা, নারীর প্রতি বৈষম্য/অসমতা, নারী শিক্ষায় অনাগ্রহ, পরিবারের দায় দায়িত্ব শুধু নারীর উপরেই চাপানো, নির্যাতন, নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাল-চলন, গতিবিধি, পছন্দ-অপছন্দ নিয়ন্ত্রন করা, কর্মক্ষেত্রে অসম্মান ও যৌন হয়রানি, উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা, যৌন অধিকার, যৌনতা, সন্তান ধারন, জন্মদানে নারীর ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রাধান্য না দেয়া, নারী অবকাশ নিজস্ব যতœকে উপেক্ষা ও অবহেলার চোখে দেখা – সবই পিতৃতন্ত্র ও পুরুষতন্ত্রের বহিঃপ্রকাশ।

 

সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় বেড়ে ওঠা একজন নারীও একই চিন্তাধারায় বেড়ে ওঠে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রনের প্রশ্নে আমরা একজন নারীর মধ্যেও এই পিতৃতন্ত্রের রুপ দেখতে পাই। যেটাকে নিয়ে পুরুষ ও সমাজ বারংবার প্রশ্ন তোলে। সুতরাং পিতৃতান্ত্রিক ধ্যান-ধারনার পরিবর্তন নারী-পুরুষের উভয়ের মধ্যে প্রয়োজন।

 

৭। নারীবাদ (Feminism) বলতে আমরা কী বুঝি ?

নারীর অধঃস্তন অবস্থা পরিবর্তনের প্রচেষ্টার প্রক্রিয়ার সাথে নারীবাদ সম্পর্কিত। মানবাধিকার প্রশ্নে একজন মানুষ হিসেবে নারীর পূর্ণ অধিকারের দাবী নারীবাদ তুলে ধরে। আধুনিকতায় এসে নারীবাদের সংঙ্গা দাঁড়িয়েছে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে নারীর হীন মর্যাদা সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা এবং এই অবস্থা পরিবর্তনে নারী ও পুরুষের যৌথ উদ্যোগে সচেনতার উদ্যোগ গ্রহন। প্রচলিত শ্রম বিভাজন নারীকে সংসারের পুরো দায়-দায়িত্ব বহন করতে বাধ্য করে, বিনা মজুরীতে, স্বীকৃতিতে নারীকে উৎপাদনশীল, অনুৎপাদনশীল সকল কাজের বোঝা চাপিয়ে দেয়, অন্যদিকে পুরুষকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং সামাজিক রাজনৈতিক ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দেয়- নারীবাদ এ সকল কিছুকেই চ্যালেঞ্জ করে।

 

নারীদের পরিপূর্ণ মানুষ ও মর্যাদার স্বীকৃতির জন্য নারী-পুরুষ নির্বিশেষে এ দায়িত্ব পালন করা প্রয়োজন। নারীর মানবাধিকার সুরক্ষা সকলের দায়িত্ব। তাই নারীবাদ নারীদের একার আন্দোলন হতে পারে না।

 

৮। নারীর মজুরীবিহীন কাজগুলো জাতীয় আয় বা জিডিপি-তে অর্ন্তভূক্ত নয় কেন?

গৃহস্থালি কাজ এবং ঘরের উৎপাদনশীল কাজকেও অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে কম গুরুত্ব¡ দেয়া হয়। রাষ্ট্রও নারীর মজুরীবিহীন কাজকে মূল্য দেয় না। জিডিপি পরিমাপ করার ক্ষেত্রে অনেক মতামত রয়েছে। ইউনাইটেড নেশনস সিস্টেম অব ন্যাশনাল একাউন্টস’র (টঘঝঘঅ) এর গাইডলাইন অনুযায়ী নারীর শ্রমকে তখনই জাতীয় আয়ের হিসাবে ধরা হয়, যখন তার আর্থিক মূল্য থাকে অর্থাৎ যে কাজের জন্য টাকা পাওয়া যায়। যদি একজন পুরুষ তার প্রাথমিক কাজ হিসাবে সবজি চাষ করে, তখন সেই সবজিগুলো জাতীয় সম্পদের অংশ হিসাবে ধরা হয়। এমনকি সেই সবজি যদি বাজারজাত না হয়ে ঘরে খাবার জন্য চাষ করা হয় তবুও সেটাকে আর্থিক কাজ হিসাবে ধরা হয়। কিন্তুএকজন নারী যখন ঘরে খাওয়ার জন্য কিছু চাষাবাদ করে, সেই চাষাবাদের কোনো হিসাব করা হয় না। যদি না তা নারীর মূল কাজ অর্থাৎ সবজি বিক্রির জন্য উৎপাদিত হয়। আবার, নারী যখন নিজের ঘরে সন্তানকে লেখাপড়া শেখান সেটা শ্রম বা কাজ হিসাবে স্বীকৃত না। কিন্তুএকই কাজ যখন ঘরের বাইরে দেখা হয় তখন তার স্বীকৃতি পাওয়া যায়, কারণ অর্থমূল্য রয়েছে। একই কাজ ঘরের ভিতরে করার কারণে সেটা মূল্যহীন ও মর্যাদাহীন। এভাবেই নারীর অবদানকে অবহেলা করা হয়।

 

যদি একজন নারী বলে যে, তার মূল কাজ হচ্ছে গৃহস্থালী কাজ, তাহলে মনে করা হয় সে দেশের অর্থনীতিতে কোনো অবদান রাখছে না বরং সামাজিকভাবে তাকে নির্ভরশীল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। অর্থনৈতিক মূল্য আছে এমন কোনো কাজ গৃহিণীরা করে বলে ইউএনএসএনএ মনে করে না। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কারণে শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ সীমিত করে রাখা হয়েছে যা কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্যের সৃষ্টি করে। নারী বাধ্য হয় ঘরের কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে। তাছাড়া পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গৃহস্থালী কাজকে নারীর স্বাভাবিক কাজ ও দায়িত্ব হিসাবে চিহ্নিত করে এবং তা নিয়েই নারীকে সন্তুষ্ট থাকতে হয়। তাই নারীদের সকল অবদান আড়ালেই থেকে যায়, মূল্যায়ন করা হয় না।